ছাত্রদলের ২৯ ইউনিটে নতুন কমিটি; পদবঞ্চনার জেরে রাঙামাটি-কক্সবাজারে বিক্ষোভ

বুটেক্স ও রাবিপ্রবিতে পূর্ণাঙ্গ, ঢাকা কলেজে বর্ধিত কমিটি; কেন্দ্রীয় সভাপতির আশ্বাসে রাঙামাটিতে অবরোধ প্রত্যাহার

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল গত শনিবার (২ মে) দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ২৯টি ইউনিটের কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনের সই করা পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

নতুন কমিটি ঘোষণার পরপরই রাঙামাটি, কক্সবাজার ও বগুড়ায় পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। রাঙামাটিতে প্রায় আট বছর পর গঠিত জেলা কমিটিকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম কমিটি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিলে অবরোধ প্রত্যাহার করেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ কমিটি
সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ও রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় (কিশোরগঞ্জ), পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটিতে (পাবনা) আংশিক এবং জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত কমিটি দেওয়া হয়েছে।

মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর মেডিক্যাল কলেজে আংশিক কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে।

কলেজ কমিটি

পাঁচটি কলেজের মধ্যে আনন্দমোহন কলেজে (ময়মনসিংহ) পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়েছে। জয়পুরহাট সরকারি কলেজ, হাজী মিছির আলী ডিগ্রি কলেজ ও নারায়ণগঞ্জ কলেজে আংশিক পূর্ণাঙ্গ এবং ঢাকা কলেজে বর্ধিত কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে।

মহানগর ও জেলা কমিটি
নয়টি মহানগরের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহ মহানগর, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ও জামালপুর মহানগরে পূর্ণাঙ্গ ও কুমিল্লা মহানগরে আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

নেত্রকোনা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে। রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়—যা প্রায় ৭ বছর ১০ মাস ২৭ দিন পর জেলায় কোনো কমিটি গঠন।

সময়রেখা: কেন এখন এই কমিটি?
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যের একটি আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে তা ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রূপ নেয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ।

২০২৬ সালের ৮ মার্চ বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল জানান, দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় শাখাগুলোর কমিটি ঘোষণা করা হবে। অবশেষে মেয়াদ শেষের প্রায় আড়াই মাস পর ২ মে এ ঘোষণা এল।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিন ইউনিট কমিটি ‘ঝুলে’ থাকায় তৃণমূল সক্রিয়করণ ব্যাহত হচ্ছিল। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর সংগঠনটিকে নতুন করে সাজানোর জরুরি প্রয়োজন থেকেই এই কমিটি পুনর্গঠন।

পদবঞ্চনার প্রতিক্রিয়া
রাঙামাটি: প্রায় আট বছর পর জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা পৌরসভা চত্বর থেকে মিছিল বের করে জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। তারা অভিযোগ করেন, কমিটিতে বিবাহিত বা আর শিক্ষার্থী নন—এমন ব্যক্তিদের আনা হয়েছে, কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। পরে কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম কমিটি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিলে বিকাল সোয়া ২টার দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।

কক্সবাজার: জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর পদবঞ্চিত নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সভাপতি তাদের ক্ষমা চেয়ে বলেছেন—‘আমি দুঃখিত, আমার হাত-পা বাঁধা।’ তারা জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের অনুসারীদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

বগুড়া: জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, কমিটিতে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও ছাত্রলীগের লোকজন জায়গা পেয়েছেন, আর দীর্ঘদিনের ছাত্রদলকর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তারা কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে ন্যায্যতা না পেলে অনশনের হুমকি দিয়েছেন।

রাজশাহী মহানগর: ৩ মে কেন্দ্রীয় কমিটি রাকিন রায়হান রাবিনকে আহ্বায়ক ও ইমদাদুল হক লিমনকে সদস্যসচিব করে আংশিক কমিটি অনুমোদন করে। এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষণ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ছাত্রদলের এই কমিটি পুনর্গঠন বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে সংগঠনটিকে:

১. পদবঞ্চনার বিক্ষোভ রাঙামাটি, কক্সবাজার, বগুড়া ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা প্রমাণ করে, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আরও সমন্বয় প্রয়োজন। রাঙামাটিতে কমিটি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস ইঙ্গিত দেয়, জেলা পর্যায়ের মতামতকে গুরুত্ব না দিলে সংকট বাড়তে পারে।

২. স্বচ্ছতার সংকট কেন্দ্রীয় ও ইউনিট পর্যায়ের অনেক নেতাই অভিযোগ করেছেন, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতার অভাবে সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ব চলছে। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তৃণমূলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ স্পষ্ট।

৩. উত্তরসূরি নির্ধারণ বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এখনো গঠন করা হয়নি। ফলে নতুন গঠিত ২৯ ইউনিটের কমিটি কার নির্দেশনায় কাজ করবে—তা অনির্ধারিত রেখেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করবেন বলে জানা গেছে, তবে সে প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

তবে সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের কাছে এই কমিটি পুনর্গঠন স্বস্তি এনেছে। ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় ২৩ বছর পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি পাওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা আশা করছেন, আন্দোলন ও সংগঠন সচল করতে এটি ভূমিকা রাখবে। বুটেক্স ও রাবিপ্রবির মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি শিক্ষার্থী রাজনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে পারে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক ইত্তেফাক ও স্থানীয় সংবাদদাতাদের প্রতিবেদন

দবানিঃডেস্ক/মে-২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *