কক্সবাজারের জঙ্গল আস্তানা থেকে মালয়েশিয়ার গুদাম—জিম্মি-মুক্তিপণের শৃঙ্খলে বাঁধা মানবপাচারের ভয়াবহ চিত্র
গত মাসের শুরুতে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের গভীরে এক নীরব ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। টেকনাফের বাহারছড়া সংলগ্ন সমুদ্র থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি মাছধরা ট্রলারে করে পাচার হতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন অন্তত ২৬৪ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। তাদের মধ্যে ছিলেন কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপহৃত, প্রলোভিত ও জিম্মি করা নিরীহ মানুষ। ৭ এপ্রিল রাতে আন্দামান সাগরে ট্রলারটি ডুবে যাওয়ার পর ৩৬ ঘণ্টা ভাসার পর নাটকীয়ভাবে উদ্ধার পেয়েছেন মাত্র ৯ জন। আর বাকিরা ফিরেননি কখনোই।
একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার তিন সপ্তাহব্যাপী তদন্তে উঠে এসেছে অপহরণ থেকে মাঝসমুদ্রের মারামারি, পানির অভাবে প্রাণহানি, সাগরে লাশ ফেলা, ট্রলার ডুবি এবং জিম্মিদশার দ্বিতীয় অধ্যায় মালয়েশিয়ায় পাচার হওয়া জীবিতদের নির্যাতনের চিত্র।
এক পলকে ঘটনাপ্রবাহ
৪ এপ্রিল ২০২৬, রাত সাড়ে ৮টা: কক্সবাজারের বাহারছড়া থেকে ৪২ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি মাছধরা ট্রলার গভীর সাগরে ছাড়ে। গন্তব্য মালয়েশিয়া। সঙ্গে প্রায় ২৭০ জন যাত্রী।
৭ এপ্রিল, গভীর রাত: আন্দামান সাগরে পানি না দেওয়ায় যাত্রীদের বিক্ষোভ। মারধর, ৩৩ জনকে বরফঘরে বন্দি করে ঢাকনা বন্ধ করে দেওয়া। অক্সিজেন অভাবে তাদের মৃত্যু।
৮ এপ্রিল ভোর: মাঝির নির্দেশে মরদেহ সাগরে ফেলা শুরু হলে ট্রলার ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়ে যায়। পানি ঢুকতে শুরু করে। হুড়াহুড়ির মধ্যে ট্রলার ডুবে যায়।
৮-৯ এপ্রিল: জীবিতরা ডোবা, কাঠ, ভাসানো জাল ও ফ্লোট আঁকড়ে সমুদ্রে ভাসতে থাকেন।
৯ এপ্রিল সকাল: ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’ সমুদ্রে ভাসমান কয়েকজনকে দেখতে পায়। তিন ঘণ্টা অভিযানে উদ্ধার হয় ৯ জন।
১১ এপ্রিল রাত: উদ্ধারকৃতদের কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২৫ এপ্রিল থেকে: কালের কণ্ঠের অনুসন্ধান দল সরেজমিনে কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প, এমনকি মালয়েশিয়া গিয়ে পাচারের সম্পূর্ণ চিত্র ফাঁস করে।
অপহরণের কাহিনি: জঙ্গল থেকে ট্রলার
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজারের কলাতলী মোড়, টেকনাফের ঝরনা চত্বরে সক্রিয় অপহরণকারীচক্র সিএনজি ও টমটমের চালকদের মাধ্যমে অচেনা যাত্রীদের ফাঁদে ফেলে। চালকরা তাদের নির্জন এলাকায় নিয়ে ৫০ হাজার টাকায় ‘বিক্রি’ করে দেয় অপহরণকারীদের কাছে। পরে তাদের আটকে রাখা হয় বাহারছড়ার কচ্ছপিয়াসহ দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলের বন্দিশালায়। সেখানে নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিচারে নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। যারা দিতে অক্ষম অথবা মালয়েশিয়া যেতে ‘রাজি’ নয়, তাদের জোর করে ট্রলারে তোলা হয়।
ভুক্তভোগী রেজাউল করিম (কুষ্টিয়া): “চোখ বেঁধে পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে ৫০ হাজারে বিক্রি করে। সেখানে শত শত মানুষ বন্দি। ১৫ দিন পর আবার ৬০ হাজারে অন্য পাচারকারীর কাছে বিক্রি করে। পরে পালিয়ে বিজিবির আশ্রয় নিই।”
উদ্ধার হওয়া আয়েশা খাতুন (টেকনাফ): “পাহাড়ের বন্দিশালায় গাদাগাদি করে রেখে ছয় দিন নির্যাতন। বিজিবি উদ্ধার না করলে মরেই যেতাম।”
অপহরণের শিকার জয়নালের মা খালেদা বেগমের ভাষায়— “শুদ্ধ চাচায় লই যাইয়েরে পোয়ারে বেছি ফেইল্যে (নিজ চাচাই আমার ছেলেকে বিক্রি করে দিয়েছে)।”
কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি পাচারকারী চক্রের সদস্যদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, একজন অপহৃতকে ৫০ হাজার টাকায় কেনার পর মালয়েশিয়ায় পৌঁছে চার লাখ টাকায় ‘বিক্রি’ করা হয়।
ট্রলারডুবির ভয়াবহ বর্ণনা
ডুবে যাওয়া ট্রলারটির দৈর্ঘ্য ছিল ৪২ ফুট, প্রস্থ ১৫ ফুট ও উচ্চতা ১২ ফুট। নিচের বরফঘরে (৪২ ফুট দৈর্ঘ্য, ১২ ফুট প্রস্থ, ৮ ফুট উচ্চতা) গাদাগাদি করে মানুষ রাখা হয়েছিল। জীবিত ফেরা রফিক, ইমরান ও রাহেলার বয়ান অনুযায়ী:
৭ এপ্রিল রাতে তৃষ্ণার্ত যাত্রীরা পানি চাইলে নির্বিচার মারধর চালানো হয়।
এক ফোঁটা পানিও না দিয়ে ৩৩ জনকে বরফঘরে ঢুকিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অক্সিজেনের অভাবে তারা মারা যায়।
মাঝির নির্দেশে লাশ সাগরে ফেলতে গিয়ে ট্রলার ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়। পানি ঢুকে হুড়াহুড়ি শুরু হয়।
পুরো ট্রলারটি ৮ এপ্রিল ভোরের দিকে ডুবে যায়।
রফিক বলেন, “মাঝি লাশ ফেলার নির্দেশ দিল। ফেলতে ফেলতে ট্রলার উল্টে যায়। ওপরে ওঠার চেষ্টা করছি, কিন্তু সবাই নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।”
৩৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার: মাত্র ৯ জন
৯ এপ্রিল সকালে চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’ আন্দামান সাগরে ভাসমান কয়েকজনকে দেখতে পায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন ওমর জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে তিন মাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৯ জনকে উদ্ধার করি। তাদের অবস্থা ছিল ভয়াবহ—নোনা পানিতে চামড়া পুড়ে গেছে, কারোর কাপড় ছিল না।”
উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ছয়জন (ট্রলারের মাঝিসহ) পাচারকারীচক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তারা বর্তমানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি। বাকি তিনজন—রফিক, এনাম উল্যাহ ইমরান (১৯) ও রাহেলা বেগম (২৫)—রোহিঙ্গা শরণার্থী।
ইমরান বলেন, “ট্রলার ডোবার সময় চারিদিকে শুধু আল্লাহর নাম আর কালিমা পড়ার শব্দ। আমি পানির ট্যাংকি ধরে ভাসছিলাম।”
রাহেলার হাত ও শরীরে এখনও ইঞ্জিনের গরম তেল ও লবণপানিতে পোড়ার দাগ। তিনি বলেন, “দুই দিন ভাসার পর কাঠের টুকরাটিও হারিয়ে ফেললে জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরে দেখি আল্লাহ একটি জাহাজ পাঠিয়েছেন।”
জিম্মিদশার দ্বিতীয় অধ্যায়: মালয়েশিয়ায়
এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধান দল মালয়েশিয়া গিয়ে সাক্ষাৎ করে শাহীন আলমের মতো পাচার হওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে। শাহীন ২০২৩ সালের নভেম্বরে ট্রলারেই মালয়েশিয়া যান।
তিনি বলেন, “কক্সবাজার থেকে পাঁচ দিন পর থাইল্যান্ড সীমান্তে পৌঁছাই। সেখান থেকে স্পিডবোটে ‘পাডান গুসার’ জঙ্গলে নেওয়া হয়। দালালদের হাতে অস্ত্র। পাহাড়ি পথে ইন্দোনেশিয়া, তারপর স্পিডবোটে মালয়েশিয়ার ‘সিঙ্গাবাতানি’ গুদামঘরে আটক রাখা হয়। সাড়ে তিন লাখ টাকা দেওয়ার পর মুক্তি পাই।”
পাচারকারী চক্রের সদস্য নূরসহ কয়েকজনের কাছে মুক্তিপণের টাকা নগদ পরিশোধের ভিডিও ফুটেজও হাতে পেয়েছে কালের কণ্ঠ।
আইনি পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা
টেকনাফ মডেল থানায় কোস্ট গার্ডের শাহপরী আউটপোস্টের চিফ পেটি অফিসার এম শাসছুল আলম মিয়া বাদী হয়ে পাচার ও অপহরণের মামলা দায়ের করেছেন।
উদ্ধারকৃত ৯ জনের মধ্যে ছয়জন জিজ্ঞাসাবাদে পাচারকারী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বীকার করায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে উখিয়া ক্যাম্পের অপহরণকারী নূর ও টেকনাফের দালাল ফারুক, মাহবুবুর রহমান মাম্মা পলাতক।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, গত ১৬ মাসে এ থানায় ৩২টি অপহরণের মামলা হয়েছে; অধিকাংশই মাদক ও মানবপাচারসংক্রান্ত।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) সূত্রে জানা গেছে, ট্রলারটিতে আড়াই শতাধিক মানুষ ছিল, যাদের শতাধিক বাংলাদেশি ও বাকিরা রোহিঙ্গা।
বিশ্লেষণ: ভয়ংকর চক্রের বিরুদ্ধে যা প্রয়োজন
এই মর্মান্তিক ঘটনা একটি সুসংগঠিত, আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও জিম্মি-মুক্তিপণ চক্রের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। তারা শুধু দুর্বল মানুষের স্বপ্ন পুঁজি করছে না, বরং সাগরের মাঝে হত্যা ও নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।
১. স্থানীয় পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের টহল বাড়ানো জরুরি — বিশেষ করে বাহারছড়া, শাহপরীর দ্বীপ ও টেকনাফের নির্জন সমুদ্রপথে নজরদারি বাড়াতে হবে।
২. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা — থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযান জরুরি।
৩. রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ওপর কড়া নজরদারি — পাচারকারী চক্রের সদস্যরা এখনও ক্যাম্পে আস্তানা গেড়ে রেখেছে।
৪. ভুক্তভোগীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসন — উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভাঙা; তাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি দরকার।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কূটনৈতিক পথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ২৬৪ জনের বেশির ভাগের বাঁচার আর কোনো আশা নেই। তাদের স্বজনরা অপেক্ষায় আছেন—মরদেহও যদি ফিরে পেতেন! সমুদ্রের বুকে অসংখ্য পরিবারের চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার এই বিয়োগান্তক কাহিনি প্রমাণ করে, অর্থের লোভে মানুষের মর্যাদা আর জীবন একেবারে নগণ্য হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: কালের কণ্ঠের তিন সপ্তাহব্যাপী সরেজমিন অনুসন্ধান; উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী, ট্রলারের কারাবন্দি মাঝি, জাহাজের ক্যাপ্টেন ও কক্সবাজারের স্থানীয় সূত্র; আইওএম প্রতিবেদন; টেকনাফ থানা ও কোস্ট গার্ডের মামলা নথি।
দবানিঃডেস্ক/মে-২০২৬