রাজনীতির ইতিহাসে ‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত সময়টির অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী সাবেক সেনাকর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সম্প্রতি রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদে এমন সব তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা তৎকালীন সামরিক-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অভ্যন্তরীণ চিত্র উন্মোচিত করেছে।
ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধের পরিকল্পনা:
মাসুদ উদ্দিনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, জিয়া পরিবারের প্রতি তার মূল ক্ষোভের কারণ ছিল তাকে সেনাপ্রধান পদে না নেওয়া। আত্মীয়তা সত্ত্বেও এই ‘অবহেলা’র প্রতিশোধ নিতেই তিনি বিএনপি ও জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ ‘মাইনাস’ করার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, এক-এগারোর সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শুধু এই লক্ষ্য পূরণের জন্যই।
তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের নেপথ্য:
মাসুদ উদ্দিন তদন্তকারীদের কাছে পরিষ্কার জানিয়েছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পুরো পরিকল্পনাটি তারই করা। তিনি আশা করেছিলেন, এ ধরনের চাপ প্রয়োগে বেগম খালেদা জিয়া সব শর্ত মেনে নেবেন এবং দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাবেন। কিন্তু খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত অনড় থাকায় তাদের সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। মাসুদ উদ্দিন আরও জানান, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলেও শুধু ক্ষোভের বশেই তিনি ওই নির্যাতন চালান।
সেনাপ্রধান হওয়ার স্বপ্ন ও ভেস্তে যাওয়া পরিকল্পনা:
তিনি স্বীকার করেন, এক-এগারোর পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ পদ ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি নিজেই সেনাপ্রধান হতে চেয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, মইন ক্ষমতা ছাড়লে তিনিই সেই পদ পাবেন। কিন্তু বেগম জিয়ার অনমনীয় অবস্থান ও বিভিন্ন কূটনৈতিক বাধায় তা সম্ভব হয়নি।
অবৈধ সম্পদের হিসাব:
মাসুদ উদ্দিন রিমান্ডে জানান, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি অবৈধভাবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার এসব সম্পদ রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
এক-এগারোর নাটকীয়তা ও ভূমিকা:
‘এক-এগারো’ বিষয়ক গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী খেলোয়াড়। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের নেপথ্যে মূল ভূমিকা রাখেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। কিন্তু মাসুদ উদ্দিনসহ আরও তিন সেনাকর্মকর্তা—ফজলুল বারী ও এটিএম আমিন—সেই সময় ব্যাপক আলোচনায় আসেন। এদের মধ্যে বর্তমানে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়া কেউ দেশে নেই।
ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পেছনেও মাসুদ উদ্দিনের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। মইন উ আহমেদ তাঁর ‘শান্তির স্বপ্নে’ বইতে লিখেছেন, প্রথমে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। পরে ড. ফখরুদ্দীনের নাম উঠলে মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গভীর রাতে তাঁর বাসায় গিয়ে অনুরোধ করেন। তখন মইন নিজেও ফোন করে তাঁকে পদ গ্রহণে আমন্ত্রণ জানান।
মইন উ আহমেদ আরও লিখেছেন, উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে সাভার ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সর্বাত্মক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন। দীর্ঘদিন ডিজিএফআইতে কর্মরত থাকার কারণে তাঁর মতামত ওই পরিষদ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
জরুরি অবস্থা জারির ঘটনা:
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির দিন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সঙ্গে বঙ্গভবনে যাওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন। তিনি সেদিন সশস্ত্র অবস্থায় গিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। এর ফলেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকেও পদত্যাগে বাধ্য হন।
‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ ও দল ভাঙার চেষ্টা:
এক-এগারো পরবর্তী সময়ে তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা চালানো হয়। মাসুদ উদ্দিন রিমান্ডে স্বীকার করেছেন, সংস্কারের নামে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ভাঙার তিনি ছিলেন মুখ্য কারিগর। কাউকে ভয় দেখিয়ে, কাউকে টোপ দিয়ে আলাদা বিএনপি গঠনের চেষ্টা চালানো হয়। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন। এছাড়া ‘মাইনাস ফর্মুলা’র প্রবর্তক হিসেবে তিনি দুটি প্রভাবশালী পত্রিকার সম্পাদকের নামও উল্লেখ করেন, যাদের সঙ্গে সে সময় তিনি নিয়মিত বৈঠক করতেন।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অন্তরাল:
এক-এগারো সরকারের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নেপথ্যে মাসুদ উদ্দিনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় বহু শীর্ষ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে, অনেক গ্রেপ্তারেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। মাসুদ উদ্দিনের নেতৃত্বে শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তথাকথিত তালিকা তৈরি করে তাদের থেকে জোরপূর্বক অর্থ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট এ অর্থ আদায়কে অবৈধ ঘোষণা করে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলেও আজ পর্যন্ত তা ফেরত দেওয়া হয়নি। মাসুদ উদ্দিন নিজেও স্বীকার করেন, ওই সময় বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
জীবনের ঝরাপাতা:
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কর্মজীবন শুরু ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীতে। জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে তাকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। রক্ষীবাহিনী থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হওয়ার কৃতিত্ব শুধুমাত্র তাঁরই। ২০০৭ সালে তিনি সাভারের নবম ডিভিশনের জিওসি (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং) থাকায় ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন।
পারিবারিকভাবে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মীয়। তার ছোট ভাই সাঈদ এসকান্দারের ভায়রা ভাই—এই সূত্রে তাঁর পদোন্নতি ও প্রভাব প্রসারের বিষয়টি বহুল আলোচিত।
তবে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সঙ্গে মতভেদ হওয়ার পর ২০০৮ সালের ২ জুন তাকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। ২ সেপ্টেম্বর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার তিন দফায় তার চাকরির মেয়াদ বাড়ায়।
মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট গঠন:
অবসরের পর তিনি ব্যবসায় জড়ান। জনশক্তি রপ্তানি ও রিক্রুটিং ব্যবসার লাইসেন্স পান। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল অর্থ কামানোর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ‘পল্টিনীতি’:
এছাড়া তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ফেনী-৩ (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) আসন থেকে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন; পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। রাজনৈতিক মহলের মতে, সে সময় আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতৃত্বের পরামর্শেই জাতীয় পার্টিতে তার যোগদান ঘটে।
গ্রেপ্তার ও বর্তমান মামলা:
গত ২৩ মার্চ বারিধারা থেকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি নিহতের মামলায় তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এর আগে ১১ এপ্রিল চার দিনের পুলিশ হেফাজতের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়; ২৭ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান।
২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করে সিআইডি। তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আরও নানা তথ্য উদঘাটনের জন্য তাকে আবারও রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন ও দৈনিক ইত্তেফাক
দবানি-বিডি/মে/২০২৬