লাভের গুড় খাচ্ছে দিল্লি । ৬ হাজার রকমের পণ্য আমদানি, বছরে ব্যয় ১৬ বিলিয়ন ডলার । ২ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে বাংলাদেশের রপ্তানি । অশুল্ক বাধা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অনিচ্ছায় বাণিজ্য বাড়ছে না
কী আসে ভারত থেকে : আমদানিকারকরা বলছেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে কী আসে- এমন প্রশ্ন না করে বলা উচিত ভারত থেকে বাংলাদেশে কী না আসে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, ট্রয়লেট্রিজ, যানবাহন, ওষুধ এবং নিত্যপণ্য ছাড়াও প্রয়োজন নাই এমন পণ্যও আমদানি হয়। আর পার্শ্ববর্তী এই দেশটি থেকে অবাধ আমদানি বেড়েছে মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের গত পনের বছরে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে এ পর্যন্ত ২৪টি শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি স্থলবন্দরের কার্যক্রম চলছে। এর বাইরে প্রায় অর্ধশত শুল্ক স্টেশন রয়েছে। যেগুলোর মাধ্যমেও দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলে। কয়েকটি স্থলবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে গবাদিপশু, তাজা ফলমূল, গাছগাছড়া, বীজ, গম, পাথর, কয়লা, রাসায়নিক সার, চায়না ক্লে, কতাঠ, টিম্বার, চুনাপাথর, পিঁয়াজ, মরিচ, রসুন আদা, বলক্লে, ব্যবহার্য কাঁচা তুলা, চালম, মসুর ডাল, কোয়ার্টজ, তাজা ফুল খৈল, গমের ভূসি ভুট্টা, চালের কুঁড়া, সয়াবিন কেক, শুঁটকি মাছ, হলুদ, জীবন্ত মাছ, হিমায়িত মাছ, পান, মেথি, চিনি, মসলা, জিরা, মোটর পার্টস, স্টেইনলেস স্টিল, রেডিও-টিভি পার্টস, মার্বেল স্লাব, শুকনো তেঁতুল, ফিটকারি অ্যালুমিনিয়াম, কিচেনওয়্যার, ফিস ফিড, আগরবাতি, জুতার সোল, শুকনা কুলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়েছে এই স্থলবন্দর দিয়ে। এর বাইরে দিনাজপুরের হিলি, লালমনিরহাটের বুড়িমারী, পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা, সিলেটের জকিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দর, ময়মনসিংহের গোবড়াকুড়া, শেরপুরের নাকুগাঁওসহ বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সারা বছরই নানা ধরনের পণ্য আমদানি হয়। এসব বন্দরের বেশির ভাগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত ১৫ বছরে।
অবাধ আমদানির সুযোগ থাকলেও রপ্তানি সুবিধা কম : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মূল পথ ছিল যশোরের বেনাপোল দিয়ে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের সূত্র ধরে দেশের অন্যান্য স্থলবন্দর দিয়ে ব্যাপকভাবে পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। স্থলবন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১৫ বছরে বিভিন্ন সীমান্তে স্থলবন্দরগুলো চালু করা হলেও এ থেকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা খুব একটা লাভবান হতে পারেননি। শেরপুরের নাকুগাঁও আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ভারতের সঙ্গে আমাদের যেসব স্থলবন্দর রয়েছে, তার বেশির ভাগ দিয়েই দেশটি সর্বোচ্চ পণ্য রপ্তানির সুযোগ নেয়; বিপরীতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সুযোগ খুবই কম।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর প্রেসিডেন্ট আশরাফ আহমেদ বলেন, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আসে ভারত থেকে। অন্যান্য পণ্যও আমদানি হয়। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। এই নির্ভরশীলতা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব পণ্য ভারতের বাইরে অন্য দেশ থেকে আনা যায় সেসব পণ্য আমদানিতে নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিগত সময়ে আমরা খাদ্যসহ নিত্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে একটিমাত্র দেশের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এ ধরনের অতিনির্ভরশীলতার কারণে নির্ভরশীল দেশ সবসময় ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে বাংলাদেশকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভারত নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেসব পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। যেসব পণ্য উৎপাদনের সুযোগ কম, সেগুলো আমদানির জন্য বিকল্প উৎস্য অনুসন্ধান করতে হবে।