মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি—সরকার নির্ধারিত খরচের চার থেকে দশগুণ বেশি পরিশোধ; দালাল-সিন্ডিকেটের কবলে অভিবাসন খাত
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষাধিক নারী-পুরুষ কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু এই যাত্রা অনেকের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ করে বিদেশে যেতে হচ্ছে বেশির ভাগ শ্রমিককে। ফলে বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেও অনেকে দুই থেকে তিন বছর সময় নিচ্ছেন শুধু নিজের বিনিয়োগ করা পুঁজি ফেরত তুলতে। এর মধ্যে আবার অনেকেই নানা প্রতারণা ও জটিলতায় পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন।
বিদেশযাত্রার খরচের চিত্র
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বায়রা সূত্রে জানা গেছে, সরকার বিভিন্ন দেশের জন্য অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় যেতে নির্ধারিত ব্যয় দেড় লাখ টাকার বেশি নয়। কিন্তু বাস্তবে এসব দেশে যেতে শ্রমিকদের চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। নিচে কয়েকটি দেশের নির্ধারিত ও প্রকৃত ব্যয়ের তুলনা দেওয়া হলো:
গন্তব্য দেশ সরকার নির্ধারিত ব্যয় (প্রায়) প্রকৃত ব্যয় (দালালচক্রের মাধ্যমে)
সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, জর্ডান ১.৫ লাখ টাকার কম ৪-৭ লাখ টাকা
কুয়েত ১.৫ লাখ টাকার কম প্রায় ৯ লাখ টাকা
মালয়েশিয়া ১.৫ লাখ টাকার কম সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা
সিঙ্গাপুর নির্ধারিত নয় স্পষ্টভাবে প্রায় ১৪ লাখ টাকা
জাপান নির্ধারিত নয় স্পষ্টভাবে কমপক্ষে ১২ লাখ টাকা
ইতালি নির্ধারিত নয় স্পষ্টভাবে ১৭-১৮ লাখ টাকা
অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে একপর্যায়ে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষণ: কেন এত খরচ?
অভিবাসন খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা জানান, বিদেশে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সরাসরি সুযোগ সীমিত। ফলে দালালদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই দালালচক্র ও সিন্ডিকেটের কারণেই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপছে শ্রমিকদের ওপর।
অভিবাসন ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শ্রমবাজার ধ্বংস করছে দুটি প্রধান শক্তি—সিন্ডিকেট ও গ্রামভিত্তিক দালালচক্র। এই দুই পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।
প্রতিবেশী দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইন থেকে যে খরচে একজন কর্মী বিদেশে যেতে পারেন, বাংলাদেশি শ্রমিকদের একই দেশে যেতে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। এ বৈষম্য নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের একটি অংশ দুই দেশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মধ্যেও বণ্টিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে কেউ প্রকাশ্যে নাম বলতে রাজি নন।
দেশে ফেরা শ্রমিকদের করুণ কাহিনি
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিনই সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতারিত হয়ে খালি হাতে ফিরছেন অনেক শ্রমিক। দেশে ফিরেই কেউ ক্ষোভে পাসপোর্ট ছিড়ে ফেলছেন, কেউ আবার বিদেশে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সৌদি আরব থেকে ফেরত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক শ্রমিক: “পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে গিয়েছিলাম। দালাল এক মাস রাখার পর আকামা না দিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। পাঁচ মাস ঘুরে কাজ করেছি, কিন্তু এক টাকাও বাড়িতে পাঠাতে পারিনি। পরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেল খেটে দেশে ফিরেছি।”
মালয়েশিয়া থেকে ফেরত এক যুবক: “দালালের মাধ্যমে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়ি। অবশেষে ট্রাভেল পাসে দেশে ফিরতে হয়েছে। পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে গিয়েও দুই বছর কাজ করে কিছুই জমানি না। এখন ঋণের বোঝায় নিঃস্ব।”
ফেরত আসা আরেক শ্রমিক জানান, “১০ লাখ টাকা খরচ করেছিলাম সিঙ্গাপুর যেতে। সেখানে গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ ও বেতন পাইনি। দূতাবাসে জানাতেও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত কয়েক মাস জেল খেটে দেশ ফিরেছি।”
জটিলতায় হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো
প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগ, বিদেশে গিয়ে পড়ছেন নানা সঙ্কটে:
আকামা বা ভিসা জটিলতা: অনেকের ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েও নবায়ন করাতে পারেন না। দালালের প্রতারণার কারণে ভিসা জাল হয় কিংবা সঠিক তথ্য থাকে না।
চুক্তি অনুযায়ী কাজ ও বেতন না পাওয়া: নিয়োগপত্রে উল্লিখিত কাজ ও বেতনের পরিবর্তে কম বেতনে বেশি কাজ করাতে বাধ্য করা হয়।
আইনি জটিলতা ও কারাবরণ: এসব সমস্যা সমাধানে না পেরে অনেকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে আটক হয়ে কারাগারে যাচ্ছেন।
দূতাবাসের সহযোগিতার অভাব: প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পেয়ে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি কারাগারেই দিন কাটাচ্ছেন।
এই জটিলতায় পাঁচ-ছয় লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়েও দুই-তিন বছর কাজ করেও অনেকেই তাদের পুঁজি তুলতে পারছেন না। এর মধ্যে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন।
পুঁজি তুলতে ২-৩ বছর
বিদেশগামী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণ, জমি বিক্রি অথবা ধারদেনা করে অভিবাসন ব্যয় জোগান দেন। সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, মালয়েশিয়ায় যেতে চার থেকে সাত লাখ টাকা, কুয়েতে প্রায় নয় লাখ টাকা, সিঙ্গাপুরে ১৪ লাখ, জাপানে ১২ লাখ এবং ইতালিতে ১৭-১৮ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।
এই বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিদেশে গিয়ে মাসে গড়ে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় করলেও খরচ বাদ দিয়ে জমানো মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা। সে হিসেবে, পাঁচ লাখ টাকা তুলতে প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যেই অনেকেই প্রতারণা, জটিলতা বা আইনি ঝামেলায় পড়ে টাকা হারান।
ফেরত আসা শ্রমিকদের অনেকে জানান, ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়েও ২-৩ বছর কাজ করে পুঁজি তুলতে পারছেন না। তাদের মতে, সরকারের উচিত স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দালালচক্র নির্মূল করা।
নেপাল-শ্রীলঙ্কার চেয়ে কেন বেশি খরচ?
বিদেশে অবস্থানরত একাধিক অভিবাসন ব্যবসায়ী জানান, নেপাল থেকে এখনো স্বল্প খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ থেকে একই দেশে যেতে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। তারা বলেন, ‘এই বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে অভিবাসন প্রক্রিয়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও এজেন্সি-নির্ভর। বাংলাদেশের মতো সিন্ডিকেট ও গ্রামভিত্তিক দালালচক্র সেখানে নেই। ফলে খরচ কম।
রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের দাবি, নতুন সরকারের উচিত দালালনির্ভরতা কমিয়ে স্বচ্ছ ও সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা। অন্যথায় এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে।
সংকট সমাধানে করণীয়
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছেন:
১. সিন্ডিকেট ও দালালচক্র নির্মূল: এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. সরকারি নির্ধারিত ব্যয় কঠোরভাবে বাস্তবায়ন: বিএমইটি ও বায়রা নজরদারি জোরদার করলে অবৈধ খরচ কমানো যাবে।
৩. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের কার্যকারিতা বাড়ানো: সরকারি উদ্যোগে স্বল্প ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়াতে হবে।
৪. বিদেশে দূতাবাসের ভূমিকা জোরদার: প্রবাসী কর্মীদের আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. চুক্তির স্বচ্ছতা ও ভিসা মনিটরিং: নিয়োগপত্র ও ভিসার সত্যতা যাচাইয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. পুনর্বাসন কর্মসূচি: প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা শ্রমিকদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিবাসন ব্যয় কমানো, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা জোরদার করা না গেলে এই সঙ্কট আরো গভীর হবে। আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকেই।
সূত্র: জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), বায়রা, দেশে ফেরত শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার, অভিবাসন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা।
দবানিঃডেস্ক/মে-২০২৬