ফ্লোরিডায় দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যা: লিমনের মরদেহ দেশে, বৃষ্টির জানাজা বুধবার

দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ১৮ দিন পর লিমনের দাফন, বৃষ্টির অপেক্ষা

মার্কিন মাটিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ আজ সকালে দেশে এসে পৌঁছেছে। সোমবার (৪ মে) সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে মরদেহবাহী উড়োজাহাজটি।

লিমনের মরদেহ হস্তান্তর করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ কে। এ সময় বিমানবন্দরে নিহতের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। ছেলের কফিন দেখে অঝোরে কাঁদতে থাকেন লিমনের বাবা, “পড়তে বিদেশে গিয়ে কেবল এভাবে যেন কেউ প্রাণ না হারায়”।পরে মরদেহ জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাগরিব নামাজের পর জানাজা শেষে দাফনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ মিনিটে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এমিরেটসের ফ্লাইটে লিমনের মরদেহ দেশের উদ্দেশে পাঠানো হয়।

মরদেহ দেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন মায়ামিতে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল সেহেলী সাবরীন ও কনসাল থোইং। গত ২৫ এপ্রিল লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর ওয়াশিংটন দূতাবাস, মিয়ামি কনস্যুলেট, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি ও পুলিশ বিভাগের সমন্বয়ে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) স্থানীয় সময় বেলা ২টায় ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকায় ইসলামিক সোসাইটিতে জামিলের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী, নিহতের খালা, কনসাল জেনারেল ও স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি গণমাধ্যমকর্মীরা জানাজায় অংশ নেন।

একই ঘটনায় নিহত নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি

একই হত্যাকাণ্ডের শিকার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার আরেক পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এরই অংশ হিসেবে আগামীকাল বুধবার (৬ মে) দুপুর ২টায় ফ্লোরিডার টাম্পায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এই প্রক্রিয়া সমন্বয় করছে এবং মায়ামির বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সহায়তা করছে।কনসাল জেনারেল সেহেলী সাবরীন জানিয়েছেন, পরিবারের সম্মতি নিয়ে দ্রুততম সময়ে মরদেহ দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

লিমন ও বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ

গত ১৬ এপ্রিল সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন (২৭) ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৭) নিখোঁজ হন। তাঁদের এক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানান।

এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে (২৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় আবর্জনা ফেলার কয়েকটি কালো ব্যাগের ভেতর থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত, কাপড়হীন মরদেহ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তে লিমনের মরদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

লিমনের মরদেহ উদ্ধারের দুই দিন পর ২৬ এপ্রিল একই এলাকার ম্যানগ্রোভ বনে কায়াক চালানোর সময় মাছশিকারিরা একটি কালো পলিথিনের ভেতর খণ্ডিত মরদেহের অংশ দেখতে পান। ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ নিশ্চিত করেন, উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত অংশ বৃষ্টির।

হিশাম আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে ফার্স্ট-ডিগ্রি (সর্বোচ্চ মাত্রার) পরিকল্পিত হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করেছে আদালত। এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতা, অবৈধভাবে মৃতদেহ সরানো, প্রমাণ নষ্ট করা, জোর করে আটকে রাখা ও হামলার অভিযোগও রয়েছে। হিশামের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিশামের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতে ‘নট গিলটি’ প্লিড করেছে। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, আবুঘরবেহের বিরুদ্ধে আগে একাধিকবার গ্রেপ্তারের রেকর্ড রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় ও সূত্র

লিমন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন।

এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ সরকার。

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, “যাতে সুষ্ঠু তদন্ত হয়, সুষ্ঠু বিচার হয়—সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আশা করি নিহতের পরিবার ন্যায় বিচার পাবেন।”

লিমনের মামা মর্তুজা শেখ জসিম জানান, “আমরা মার্কিন সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার আশা করি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।”

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে স্মারক স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে।এটাই সেই কঠিন সত্য ও করুণ সমাপ্তি, যখন শিক্ষার প্রদীপ জ্বালাতে বিদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন দুটি মেধাবী প্রাণ।

দবানিঃডেস্ক/মে-২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *