ঝড়-ঝঞ্ঝা-অনটন-অঘটন-আঘাতের জীবনে যখন এই সন্তানটি এলো, মানুষটি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। মায়াবী এই শিশুটি যেন জীবন বদলে দিল রণ-ক্লান্ত সৈনিকটির। সারাক্ষণ মেতে থাকেন শিশুটিকে নিয়ে, তার হাসি,তার হাত পা ছোঁড়ায় অন্য ভুবন খুঁজে পান বাবা । কাছ ছাড়া করেন না কখনোই। কিন্তু বিধি বাম, এঁর জীবন যে দুঃখ দিয়েই গড়া!
পৃথিবীর চোখে দ্বিতীয় শেলী এ মানুষটি। তাঁর প্রতাপে থরথর করে কাঁপত বৃটিশরাজ ৷ তাঁর শির আজীবন নত হয়নি কারোর কাছে। ছিল এই একটিই দুর্বলতা, এই তিন বছর বয়স্ক মায়াবী পুত্রটির চোখের চাহনি । ১৯৩০ এর ৭ মে ঝড়ের রাতে গুটি বসন্তে দীপ নিভে গেল সেই চোখে ৷
দাফন-কাফন করতে, কবরের জমি কিনতে মোটে ১৫০ টাকার প্রয়োজন৷ অথচ পৃথিবীর সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বার দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার কাছে যে সন্তানের সৎকার করতে নেই একটি পয়সাও!
ঝড়ের রাতে ছেলের লাশ ঘরে রেখে পয়সা যোগাড়ে বেরুলেন বাবা। ঘুরলেন লাইব্রেরি থেকে লাইব্রেরি। নির্মমভাবে একটি লাইব্রেরিও দিল না ফুটোকড়ি। কেবলমাত্র ডিএম লাইব্রেরি থেকে ৩৫ টাকা যোগাড় হলো।
ছুটতে হলো প্রকাশকের বাড়ি । প্রকাশক শর্ত বাঁধলেন, কারোর মরা-বাঁচায় তাঁর কি! টাকা নিতে গেলে আগে গান লিখে দিতে হবে!
ঘরে ছেলের লাশ । তার সৎকার করতে প্রকাশকের বাড়িতে বসে গান লিখলেন বাবা :
ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি।
করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি।
বন্দোবস্ত হলো। কবরস্থ হলো শিশুটির লাশ,মানুষটির অবলম্বন। এরপর বেশ কয়েকমাস অর্ধউন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন মানুষটি। জীবনের শেষ দিনটিতেও মানসিকভাবে অক্ষম সে বাবা ভুল বানানে ছেলেটির নাম লিখে গিয়েছিলেন।
কোনো সিনেমার গল্প বলছি না।
ছেলেটির নাম কাজী অরিন্দম খালেদ বুলবুল।
বাবাটি আমাদের সবহারানো নজরুল।
পৃথিবী যাঁকে দিয়েছে কেবল ব্যথা, ব্যথা, ব্যথা!
ছবিটি বুলবুলের তিন বছর বয়েসের,
ইন্টারনেটের কল্যাণে পাওয়া।
অনেকেরেই এ কথাগুলো অনেক আগেই পড়া। তারপরও যারা পড়েননি তাদের জন্য।