সেনাপ্রধানের কার্যালয় থেকে সরল পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবি, হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত ভারতের

  ঢাকার রেসকোর্স ময়দানেযৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দলিল স্বাক্ষরের ছবি।
 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া ও দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, আর্মি চিফের লাউঞ্জে নতুন একটি চিত্রকর্ম স্থাপন করা হয়েছে। এই নতুন চিত্রকর্মটি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য প্রদর্শনকারী ঐতিহাসিক চিত্রকর্মের জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন চিত্রকর্মটির নাম ‘করম ক্ষেত্র—ফিল্ড অব ডিডস’। এই চিত্রকর্মটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২৮—মাদ্রাজ রেজিমেন্টের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল থমাস জ্যাকব এঁকেছেন। এতে সেনাবাহিনীকে ‘কেবল জাতির প্রতিরক্ষা নয়, এর পাশাপাশি ধর্মের রক্ষক, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় মূল্যবোধের সংরক্ষক’—হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং একীভূত শক্তি হিসেবে রূপান্তরকেও তুলে ধরেছে।

নতুন চিত্রটির ব্যাকগ্রাউন্ডে তুষারঢাকা পাহাড়, ডানদিকে লাদাখের প্যাংগং লেক এবং বাম দিকে গরুড় ও কৃষ্ণের রথসহ চাণক্যের উপস্থিতি রয়েছে। পাশাপাশি, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম যেমন ট্যাংক, অল-টেরেইন যান, প্যাট্রল বোট, দেশীয় লাইট কমব্যাট হেলিকপ্টার এবং অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টারের চিত্রও প্রদর্শিত হয়েছে।

সূত্রটি আরও জানিয়েছে, এটি মহাভারতের শিক্ষার ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর ন্যায়পরায়ণতার প্রতি চিরস্থায়ী অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। চাণক্যের কৌশলগত ও দার্শনিক প্রজ্ঞাও এতে অন্তর্ভুক্ত, যা নেতৃত্ব, কূটনীতি এবং যুদ্ধে সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহায়ক। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন এবং ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে একটি ‘দেশজ কৌশলগত শব্দভান্ডার’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

ভারতের সেনাপ্রধানের কার্যালয়ে স্থাপিত নতুন ‘করম ক্ষেত্র’—

তবে বেশ কয়েকজন সাবেক সেনাসদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। উত্তরাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচএস পানাগ লিখেছেন, ‘গত ১০০০ বছরে ভারতের প্রথম বড় সামরিক বিজয় এবং একক জাতি হিসেবে প্রথম বিজয়—১৯৭১ সালের প্রতীকী ছবি/চিত্রকর্মটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি এমন এক পদক্ষেপ যা থেকে মনে হয় মিথ, ধর্ম এবং দূরবর্তী খণ্ডিত সামন্ত শাসনের ইতিহাস ভবিষ্যতের বিজয়ের অনুপ্রেরণা দেবে।’

উল্লেখ্য, ভারতের সেনাপ্রধানের লাউঞ্জে বাংলাদেশ সংক্রান্ত যে ছবিটি আগে টাঙানো ছিল সেটির পটভূমি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় যৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের। ঐতিহাসিক ছবিটিতে দেখা যায়, পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছেন। তাঁর পাশে বসে আছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। তাঁদের পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের কমান্ডার এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার, ভাইস অ্যাডমিরাল কৃষ্ণন, এয়ার মার্শাল দেওয়ান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগত সিং এবং মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব।

ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল মনমোহন সিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ঢাকা আত্মসমর্পণ ছবিটি সরানোর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এখানে বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সামরিক প্রধানেরা সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনাটির প্রতীকটি দেখেন। কিন্তু এখন, এই অপটু উদ্যোগ–কেন?’

পুরোনো চিত্রকর্মটি কোথায় সরানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *