যুক্তরাজ্য যাত্রার আগে প্রিয় নেত্রীকে বিদায়ি শুভেচ্ছা জানাতে গুলশানের বাসা ফিরোজার সামনে ছিল দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের উপচে পড়া ভিড়। এর ফলে একপর্যায়ে ফিরোজার সামনের রাস্তাটিতে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা ছিল ব্যাপক। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়।
বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বেলা ৩টায় ফিরোজায় প্রবেশ করেন। নেতা-কর্মীদের ভিড় ঠেলে ফিরোজা থেকে রাত ৮টায় খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়িটি গুলশান-২-এর চৌরাস্তা হয়ে কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ ধরে বনানী-কাকলী পয়েন্ট দিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। তাঁকে বহনকারী কাতার আমিরের বিশেষ বিমান ‘রয়েল এয়ার অ্যাম্বুলেন্স’টি সোমবার ঢাকায় পৌঁছায় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতার কথা জেনে তাঁর রাজকীয় বহরের এই বিশেষ বিমান দিয়েছেন। দলীয় চেয়ারপারসনকে বিদায় জানাতে গুলশানের বাসা ফিরোজা এবং বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতা দল ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী।
ঢাকা থেকে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের ছয়জন সদস্য যথাক্রমে অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার, অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক, অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদ, ডা. জাফর ইকবাল, অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও ডা. মোহাম্মদ আল মামুন তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। এ ছাড়া বেগম জিয়ার সঙ্গে তাঁর ছোট ছেলের স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ ব্যক্তিগত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বিদেশের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে আল্লাহর রহমতে আবারও সবার মাঝে ফেরত আসতে পারেন সে জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, মহাসচিব, স্থায়ী কমিটিসহ দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে।
ডা. জাহিদ হোসেন সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার নানা শারীরিক জটিলতা রয়েছে। তাঁর লিভার সিরোসিসের জটিলতা নিরসনে কিছু চিকিৎসা দেশে হয়েছে। আরও অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাঁর হার্টে একাধিক ব্লক ছিল। জীবন বাঁচানোর জন্য যেটুকু চিকিৎসা দরকার, সেটুকু করা হয়েছিল ওই সময়ে। কারণ ওই সময়ে তাঁর শারীরিক সুস্থতা সে রকম ছিল না। তাঁর আরও যে ব্লক আছে, সেগুলোর চিকিৎসা করার দরকার। জটিল যে রোগগুলো আছে, সেগুলোর যুগোপযোগী চিকিৎসা প্রয়োজন। কভিড-পরবর্তী বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা হয়েছে, সেগুলো নিরসন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা লন্ডনে মাল্টি ডিসিপ্ল্যানারি অ্যাডভান্স সেন্টারে চিকিৎসার জন্য ম্যাডামকে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানকার চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁর পরবর্তী করণীয় কী হবে।’
খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যাসহ নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছেন। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গুরুতর অসুস্থ বেগম জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে ১৮ বার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু হাসিনা সরকার তাঁকে বিদেশে যেতে অনুমতি দেয়নি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার খালেদা জিয়াকে সব মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়।
হাসপাতালেই কেটেছে সাড়ে আট মাস : ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তির পর গত চার বছরে খালেদা জিয়াকে বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে সাড়ে আট মাসেরও বেশি সময় ভর্তি হয়ে থাকতে হয়েছে। দিনের হিসাবে যা প্রায় ২৬০ দিন। আর কারাবন্দির পর থেকে এ পর্যন্ত ছয় বছরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং এভারকেয়ার হাসপাতাল সব মিলিয়ে বেগম খালেদা জিয়া দেড় বছরেরও বেশি সময় হাসপাতালে ছিলেন।
দৈনিক বিডি নিউজ / সাইফুল