চ্যালেঞ্জ উতরে দাঁড়াক অর্থনীতি

কয়েক বছর ধরেই দেশের সার্বিক অর্থনীতি ভালো নেই। অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা ও নানা শঙ্কার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে ব্যাংকসহ আর্থিক খাতগুলো। একপ্রকার খাদের মধ্যে পতিত হওয়া অর্থনীতিকে টেনে তুলতে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে গত বছর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে। কোনো সন্দেহ নেই, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের চূড়ান্ত দুঃশাসনেই অর্থনীতির এ বেহাল দশা তৈরি হয়েছে। কেননা, বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার ফেলেছে সার্বিক অর্থনীতির ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব। অর্থনীতির এ মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে তোলার প্রচেষ্টায় গত এক বছর বর্তমান সরকারের যে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল, তা বলাই বাহুল্য এবং তার সাক্ষ্যও বহন করছে অর্থনীতির বেশ কয়েকটি খাত ও সূচকে, যা সম্ভাবনার কথা বলছে। অন্যদিকে সংকটের দিকগুলোও রয়েছে, যা তৈরি করছে আশঙ্কার। বুধবার কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বিষয়টিতে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, একটি দেশের অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা মূল্যায়নে প্রাথমিকভাবে ১২টি সূচকের পর্যালোচনা করতে হয়। সেসব সূচকে দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব সূচকের মধ্যে রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য ও বিনিময় হারে বাংলাদেশ বড় সফলতা দেখিয়েছে। যদিও অন্যান্য সূচকে দৃশ্যমান তেমন কোনো উন্নতি নেই। যে কারণে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও মূলধারায় ফিরতে পারেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আমরা জানি, বিগত সরকারের শেষদিকে এসে অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভের পরিমাণ কমতে কমতে পৌঁছেছিল তলানিতে। বছরের ব্যবধানে সে রিজার্ভ বেড়েছে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয়, এ সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আগের বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৪ বিলিয়ন ডলার। বিদায়ী অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে উন্নতি ঘটেছে। এর কারণ বিশেষত রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ার কারণে। বাণিজ্য ঘাটতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি। গত অর্থবছরে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থেকেছে ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার; আর আগের অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৬ দশমিক ৬০ বিলিয়ন। এ ছাড়া কিছু ইতিবাচক দিকের মধ্যে রয়েছে দেশের মুদ্রাবিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। গত সরকারের অব্যাহত অর্থ পাচার ও হুন্ডির কারণে দেশের মুদ্রা বাজারে ছিল বড় ধরনের অস্থিরতা। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে এতে এসেছে স্থিরতা। কমেছে মুদ্রাস্ফীতি। তবে আরও যে কয়েকটি সূচকে উন্নতি সম্ভব হয়নি, তা নিয়ে আশঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া গেলে তা কাটিয়ে তোলাও সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

এ কথা সবারই জানা, বিগত সরকারের সময়ে যে সীমাহীন দুর্নীতি ও বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে, তা থেকে বের হয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলা অতটা সহজ কাজ নয়। অবশ্য সময় বিবেচনায় সরকারের অর্থ বিভাগ সে চ্যালেঞ্জের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে পেরেছে—এতে সন্দেহ নেই। হয়তো অর্থনীতির সেই ধ্বংসাবস্থা কাটিয়ে ওঠা যায়নি, তবে অর্থনীতির প্রায় ডুবন্ত অবস্থা থামানো গেছে, এটাই সবচেয়ে সুখকর দিক। এরই মধ্যে অর্থ পাচার বন্ধ হওয়া, রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়সহ কিছু ক্ষেত্রের সফলতা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। আমাদের প্রত্যাশা, অর্থনীতির অন্য যেসব সূচকে এখনো অগ্রগতি সম্ভব হয়নি, সেগুলোও যেন ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে সেজন্য যত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবিলায় সবার তরফ থেকেই সর্বপ্রকার আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আশা রাখতে চাই, অচিরেই ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *