আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরলস সেনাবাহিনী

মাঠে নেমে বিচারিক ক্ষমতা পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় মাঠের দায়িত্বে থাকায় সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তা ও সৈনিক ছুটিতে যাচ্ছেন না। বাহিনীটির চৌকষ দল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ১৪টি মেগা প্রকল্প এবং কী পয়েন্ট ইনস্টলেশনভুক্ত (কেপিআই) রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ৫৩টি স্থাপনার নিরাপত্তা সুরক্ষা দিচ্ছে। এ ছাড়া গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে। চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ডাকাত গ্রেপ্তারেও নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন টিম। পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি ও পাহাড়ি দুই পক্ষের সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করছে। গুজব প্রতিরোধ ও পূজা ম-পের নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তৎপরতা চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। দিনে-রাতে টহল ও চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি চালাচ্ছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেনাবাহিনীর নানামুখী কার্যক্রমে সারাদেশে অস্থিতিশীলতা কেটে স্বস্তি ফিরছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, সেনাবাহিনী এখনও ম্যাসিভ অপারেশনে যায়নি। মাঠে নেমেই তো বড় অপারেশনে যায় না। এখন হয়তো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। তারপর অপারেশনে যাবে। তবে বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে নামায়

জনমনে স্বস্তি ফিরেছে উল্লেখ করে অবসরপ্রাপ্ত এই সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনে চাঁদাবাজিসহ অপরাধীরা যেভাবে সারাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, সেনাবাহিনীর তৎপরতায় সেই অস্থিতিশীলতা অনেকটাই কেটে গেছে। অপরাধীরা সেনাবাহিনীর ভয়ে তটস্থ আছে। অপরাধীরা বুঝতে পারছে, এখন ধরা হলে সহজে পার পাওয়া যাবে না। ফলে তারা ভয়ে অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। মাঠে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর তৎপরতায় মানুষ অনেকটাই নিরাপদ বোধ করছে। মানুষের মধ্যে যে আস্থাহীনতা ও ভয়ভীতি ছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজপথসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব পালন করছে সেনাবাহিনী। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ক্যাম্পের যোগাযোগ নম্বর দেওয়া হয়েছে জনগণকে। যে কোনো ধরনের অপরাধের খবর পেলেই সেখানে ছুটে যাচ্ছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। গত সোমবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় ডাকাতির সংবাদে ছুটে যায় সেনাবাহিনী। সেখানে ডাকাতদের ছুরিকাঘাতে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩) নিহত হন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা সদরের উচালিয়াপাড়া এবং বাড্ডাপাড়ার মধ্যে দুপুর থেকে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশ-সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। গত সোমবার গাজীপুর সদর, কালিয়াকৈর ও আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করে সড়ক থেকে সরিয়ে দেন। মুন্সীগঞ্জের সদর ও টঙ্গীবাড়ী থানা লুট করে নিয়ে যাওয়া ২১৯টি অস্ত্র ও প্রায় আট হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে সেনাবাহিনী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাতে টহল ও তল্লাশিচৌকি স্থাপন করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে সেনাবাহিনী। সেই সঙ্গে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তাদের নিয়মিত অভিযানে মানুষের মনেও স্বস্তি ফিরেছে। চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলা, সড়কে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনে রাজধানীর সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। সন্দেহভাজন গাড়ি থামিয়ে অস্ত্র, মাদকদ্রব্য ও গাড়ির কাগজপত্র তল্লাশি করা হয়। রাজপথে মধ্যরাতে অভিযানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করে পুলিশ। গত রবিবার মধ্যরাতে পল্টন থেকে মিরপুরে ফেরার পথে শাহবাগে সেনা তল্লাশির মুখে পড়েন আহমেদ উল্লাহ। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, রাত ১২টার দিকে ফার্মগেট মোড়ে সেনাবাহিনী তল্লাশিচৌকি স্থাপন করে সন্দেহভাজন প্রত্যেকটি গাড়ি চেক করেন। ব্যক্তিগত গাড়িতে অস্ত্র ও মাদকের তল্লাশি চালান। যাদের কাগজপত্রে ত্রুটি আছে পুলিশ তাদের মামলা দিয়েছে। রাতে ঢাকার রাস্তায় টহল পুলিশের অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অভিযান স্বস্তিদায়ক।

জানা গেছে, সারাদেশের প্রয়োজনীয় স্থানে সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যরা। ফলে অতিজরুরি প্রয়োজন ছাড়া সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে রূপপুর পারমাণিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প ও পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। রূপপুরসহ ১৪টি মেগা প্রকল্পের নিরাপত্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বঙ্গভবনসহ দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআইভুক্ত স্থাপনা ৬শর কাছাকাছি। এর মধ্যে ৫৩টি কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাসদস্যদের কর্মকা- সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে প্রচার করা হচ্ছে। গুজবসহ মিথ্যা তথ্য শনাক্ত ও প্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সেনাবাহিনী। আসন্ন দুর্গাপূজা নিয়ে যে কোনো ধরনের হুমকি, গুজব ও অপরাধ প্রতিরোধে সেনাবাহিনীর টিম কাজ করছে। পাহাড়ে গুজব ছড়িয়ে এবং সন্ত্রাসীদের ইন্ধন দিয়ে কেউ যাতে সম্প্রীতি নষ্ট না করতে পারে, সে জন্যও কাজ করছে সেনাবাহিনী। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে।

দেশব্যাপী বিভিন্ন পর্যটন স্পটের সুরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানিয়েছে, ইউপিডিএফের (মূল) ডাকা ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘটে পার্বত্য অঞ্চলের সাজেকে ঘুরতে যাওয়া ১ হাজার ৪০০ পর্যটক আটকে পড়েছিলেন। তাদের সেনা সহায়তায় গতকাল খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *