অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে রেমিট্যান্স ২৯.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। রোববার (৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ১২৭ মিলিয়ন (৩.১২৭ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে প্রাপ্ত ২ হাজার ৭৫২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৩.৬ শতাংশ বেশি।
এই ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মাসিক রেমিট্যান্সের তুলনা
এপ্রিল মাসের এই রেমিট্যান্স প্রবাহ গত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় আরেকটি ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। নিচে গত কয়েক মাসের রেমিট্যান্সের চিত্র দেওয়া হলো:
মাস ২০২৬ সালের রেমিট্যান্স (মিলিয়ন ডলার) ২০২৫ সালের একই মাসে (মিলিয়ন ডলার) প্রবৃদ্ধি (%)
এপ্রিল ৩,১২৭ ২,৭৫২ ১৩.৬%
মার্চ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে (নেই) – –
ফেব্রুয়ারি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে (নেই) – –
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরেই রেমিট্যান্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
অর্থবছরের প্রথম দশ মাসের চিত্র
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল (প্রথম দশ মাস) পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৯ হাজার ৩৩২ মিলিয়ন (২৯.৩৩ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। যা গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে প্রাপ্ত ২৪ হাজার ৫৩৭ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এই ১০ মাসে বাড়তি রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার (২৯,৩৩২ – ২৪,৫৩৭ = ৪,৭৯৫ মিলিয়ন)।
এপ্রিল মাসের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো বছর রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি (যেহেতু জুলাই-এপ্রিল ২৪.৫ বিলিয়ন ছিল, শেষ দুই মাসে আরও প্রায় ২.৫ বিলিয়ন যোগ হয়েছিল)। কিন্তু চলতি অর্থবছরে মাত্র দশ মাসেই তা ছাড়িয়ে গেছে আগের পুরো অর্থবছরের সংগৃহীত রেমিট্যান্সকে।
কেন বাড়ছে রেমিট্যান্স?
বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকারদের মতে, এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করতে পারে:
১. ঈদুল ফিতরের প্রভাব: ঈদের আগে প্রবাসীরা বাড়তি অর্থ দেশে পাঠান। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর ছিল মার্চের শেষ দিকে (৩১ মার্চ)। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেও সেই প্রবাহ অব্যাহত থাকে।
২. ব্যাংক চ্যানেলে আস্থা বৃদ্ধি: বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে রেমিট্যান্স প্রেরণে খরচ কমানো ও ডিজিটাল সুবিধা বাড়ানোর ফলে ব্যাংক চ্যানেলে প্রবাসীদের আগ্রহ বেড়েছে।
৩. ডলার সংকট উত্তরণের ইঙ্গিত: গত দুই বছরের ডলার সংকটের পর রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক উত্থান অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে।
৪. প্রবাসী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপানে বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণ বেড়েছে, যা রেমিট্যান্সে প্রতিফলিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিশ্লেষণ
এই মাইলফলকের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম:
রিজার্ভ চাঙ্গা: ৩০ এপ্রিল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। এপ্রিলের শক্ত রেমিট্যান্স জুন নাগাদ রিজার্ভ আরও বাড়াবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
টাকার বিপরীতে ডলারের মান নিয়ন্ত্রণ: অব্যাহত রেমিট্যান্স প্রবাহ ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক।
আমদানি সক্ষমতা বাড়ায়: রেমিট্যান্স বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বাড়ে।
দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা: গ্রামীণ অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রত্যক্ষভাবে দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের এই ধারা ধরে রাখতে আরও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে হুন্ডি ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে অনুমান করা হয়, হুন্ডির মাধ্যমে দেশে বছরে আরও ৫-৬ বিলিয়ন ডলার প্রবেশ করে যা ব্যাংক চ্যানেলের বাইরে থাকে। ওই অর্থ যদি আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আসে, তাহলে মাসিক রেমিট্যান্স আরও ৫০০-৬০০ মিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অর্থবছরের বাকি দুই মাস (মে ও জুন) ঈদুল আজহাকে ঘিরে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলতি অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স ৩৫ থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হবে।
তবে রেমিট্যান্স নির্ভরতা কমাতে সরকারের রপ্তানি খাত ও বিদেশি বিনিয়োগে মনোযোগ দেওয়া উচিত। প্রবাসীদের ব্যাংক চ্যানেলে পাঠাতে আরও প্রণোদনা ও সহজীকরণ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী আয় বাড়ানোর পাশাপাশি এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে রেমিট্যান্স কাজে লাগানো গেলে এটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে।
এপ্রিলের এই ৩ বিলিয়ন ডলার প্রমাণ করে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তাঁদের এই অবদান ধরে রাখতে এবং আরও বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক (৩ মে ২০২৬-এর প্রতিবেদন), বাসস
দবানিঃডেস্ক/মে-২০২৬