আ.লীগ ২-৩ মাসের মধ্যে রাজনীতিতে ফিরবে: সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরাফাত
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। জুলাই হত্যাকাণ্ডে শত শত খুন ও ১৫ বছরের মেয়াদে আরও কয়েকশ ব্যক্তিকে গুমের অভিযোগসহ বিভিন্ন ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে দুই শতাধিক মামলা। এরমধ্যে অনেকগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বিচার শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এটি সেই ট্রাইব্যুনাল যেখানে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা ও বিএনপির সাকা চৌধুরীসহ কিছু নেতার বিচার ও সর্বোচ্চ সাজা হয়েছিল। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার দুটি পাসপোর্ট বাতিল করেছে, এরইমধ্যে ভারতের কাছে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরতও চেয়েছে। যদিও ফেরতের বিষয়ে নীরব থেকে শেখ হাসিনার ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে দেশটি। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এসব মামলায় আসামি সাবেক মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাসহ দলীয় সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন পদে থাকা দলীয় নেতা-কর্মীরা। অপরাধী যেই হোক, প্রতিটি মামলাতেই আসামির সংখ্যা শত থেকে সহস্রজনের মতো। মামলায় নাম উঠেছে আওয়ামী লীগ শাসনামলে সরকারের ও পুলিশের অতি উৎসাহী শত শত কর্মকর্তাদেরও। হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে আছেন কারাগারে, আসামি হিসেবে নিত্য হাজিরা দিচ্ছেন অভিযোগ ওঠা মামলাগুলোতে। তবে সাবেক সরকারের বেশির ভাগ মন্ত্রীসহ দলীয় নেতারা ‘গায়েব’ হয়ে ‘অজ্ঞাতবাসে’ চলে গেছেন । এদের একটা অংশ নানা কৌশলে সীমানা পাড়ি দিয়ে ভারতসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ঠাঁই নিয়েছেন। দেশে যারা আছেন তারাও আছেন ফেরার হয়ে। আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের দাবির মুখে সরকারি প্রচেষ্টায় ও আদালতের আদেশে এরইমধ্যে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই ছাত্রলীগের নেতারাও এখন ঘরছাড়া, দেখা গেলেই হচ্ছেন সহিংস হামলার শিকার। সাবেক সরকারের গত ১৫ বছরে দেশ থেকে লুট ও পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ এরই মধ্যে ঘোষণা করেছে সরকার, চলছে ফেরত আনার চেষ্টা ও মামলা। এক সময় বিরোধী দলে থাকা দেশের সব রাজনৈতিক দলও সারা দেশে আওয়ামী লীগকে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না রাজনৈতিক মহলে উঠেছে সে প্রশ্নও। এমন পরিস্থিতিতে ভারতে বসে দলকে পুনর্গঠনের একটি চেষ্টা চালাচ্ছেন শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা। বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি সেখানে ‘দিকনির্দেশনামূলক’ ভাষণ দেবেন এবং উদ্যোগটি সফল হলে এটিই হবে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার নেতা-কর্মীদের প্রথম বৈঠক। যদিও এর আগে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের একটি বৈঠকে গত নভেম্বরে ভার্চুয়ালি বক্তৃতা করেছিলেন শেখ হাসিনা।
‘অজ্ঞাতবাসে’ থাকা দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, শেখ হাসিনাসহ দলের নেতারা এর মধ্যেই তৃণমূলের ইউনিট নেতাদের সাথে কথা বলতে শুরু করেছেন।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কার্যক্রম চালাতে পারবে কি না সে বিষয়ে বাহাস থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সে কারণে তিনি তার দলের নেতা-কর্মীদের সাথে বৈঠক করতেই পারেন।
কী করছে আওয়ামী লীগ
বাংলাদেশে আত্মগোপনে থাকার পাশাপাশি কলকাতা ও লন্ডনে অবস্থানরত কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো জেলের বাইরে থাকা নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সংযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলটির নেতারা ধারণা দিয়েছেন কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন লেভেল পর্যন্ত দলটির সাবেক এমপি ও শীর্ষ নেতারা আটক হওয়ার কারণে সম্ভাব্য বিকল্প নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ শুরু হয়েছে।
শেখ হাসিনা এর মধ্যেই ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশের আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ের বেশ কিছু নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
অন্যদিকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ বিতর্কিত কয়েকজনকে কোনো কার্যক্রমে জড়িত না হওয়া এবং গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগের হয়ে কোনো মন্তব্য না করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে- এমন তথ্য পাওয়া গেলেও তার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যেই খবর এসেছে যে আগামী ১৯ জানুয়ারি শেখ হাসিনা তার দলের নেতাদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করবেন কিংবা নেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।
লন্ডনে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হেমায়েত উদ্দীন খান বলেছেন, আমরা জানতে পেরেছি নেত্রী ভার্চুয়াল বৈঠক করবেন। তার ভাষণে দিকনির্দেশনা দেবেন। বৈঠকটির জন্য আমরা গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আওয়ামী লীগ এভাবেই সব প্রতিকূলতা জয় করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাবে।
দলের মধ্যম সারির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে চাইছে আওয়ামী লীগ। যদিও দলটির সাবেক এমপি ও মন্ত্রীদের অনেকেই জেলে আর বাকিরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, মুহাম্মদ ফারুক খান, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও কাজী জাফরউল্লাহ বিভিন্ন মামলায় আটক হয়ে এখন কারাগারে।
অন্যদিকে, বেগম মতিয়া চৌধুরী মারা গেছেন। আর আত্মগোপনে আছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুল মান্নান, আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য এবং এদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি কারাগারে থাকলেও মাহবুব উল আলম হানিফ, ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম আত্মগোপনে রয়েছেন।
সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে আহমদ হোসেন আটক হয়ে কারাগারে আছেন। বাকিরা দেশে কিংবা বিদেশে আত্মগোপনে আছেন। সম্পাদকমণ্ডলীতে যারা ছিলেন তাদের অবস্থান সম্পর্কেও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি। খবর নেই দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়ারও।
দৈনিক বিডি নিউজ / সাইফুল